জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় আজ সোমবার ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেল এ রায় দেবেন। রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল চত্বরে ইতোমধ্যে কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, আদালত যে রায়ই দেবেন, তা যথাযথভাবে কার্যকর করা হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি : সব অভিযোগ প্রমাণিত
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। তারা তিনজনের সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা করছেন। ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, দণ্ড হলে সাজা পরোয়ানা ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো হবে।
গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা আদালতের কাছে সর্বোচ্চ দণ্ড চেয়েছি। আদালত সুবিবেচনা করবেন, তবে আমাদের প্রেয়ার সর্বোচ্চ শাস্তির।”
মামলার পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। নতুন গঠনের পর প্রথম মামলাটি হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। ১৭ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে ১৬ মার্চ সাবেক আইজিপি মামুনকে এবং একই মামলায় আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ১২ মে জমা পড়ে, যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৮ হাজার ৭৪৭। এরপর ১ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয় এবং ১০ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের সমাপনী যুক্তি উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। একই দিন আসামিপক্ষের জবাবের পর প্রসিকিউশন আবারও সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে।
রায় সরাসরি সম্প্রচার
বিটিভিতে রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। অন্য টেলিভিশন চ্যানেল ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও বিটিভির ফিড ব্যবহার করতে পারবে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চার জেলায় বিজিবি
রাজধানীসহ গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, সব বাহিনী সমন্বিতভাবে মাঠে রয়েছে।
রাজধানীতে অস্থিরতা, রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে
রায় ঘোষণার আগের দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে। মগবাজারের ইস্কাটনে বিস্ফোরণে একজন আহত হন। গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে।
রায়কে কেন্দ্র করে একদিকে আওয়ামী লীগ অনলাইনে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি রাজনৈতিক দলও মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, “বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে—এ অবস্থায় জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।”
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “ফ্যাসিবাদের পক্ষে নাশকতার সুযোগ দেওয়া হবে না। আট দল মাঠে থাকবে।”
মামলার পাঁচটি অভিযোগ সংক্ষেপে
১. উসকানিমূলক বক্তব্য ও গণহত্যা
১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী সমর্থকরা আক্রমণ চালায়। এতে দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু ও ২৫ হাজার আহত হওয়ার অভিযোগ।
২. মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ
হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা—যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি বাস্তবায়ন করেন বলে অভিযোগ। দু’টি পৃথক অডিও রেকর্ডে এই নির্দেশের প্রমাণ থাকার দাবি প্রসিকিউশনের।
৩. আবু সাঈদ হত্যা
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা।
৪. চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা
রাজধানীতে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় ছয়জন নিহত হওয়ার অভিযোগ।
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা
আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় তিন আসামিকেই দায়ী করা হয়েছে।