
মোঃ খাইরুল ইসলাম চৌধুরী:
বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতা একসময় ছিল দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও জনস্বার্থভিত্তিক একটি পেশা। কিন্তু এখন দেখা যায় উপজেলায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত “সাংবাদিক” পরিচয়ধারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের জটিলতা। এতে যেমন প্রকৃত সাংবাদিকরা বিব্রত হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কেন বাড়ছে অতিরিক্ত সাংবাদিক?
বর্তমানে খুব সহজেই অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল কিংবা ফেসবুকভিত্তিক সংবাদমাধ্যম তৈরি করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বা ন্যূনতম যোগ্যতা ছাড়াই পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে কেউ কেউ সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন।
এছাড়া
সামাজিক প্রভাব বিস্তার,
প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়া,
ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল,
রাজনৈতিক পরিচিতি বৃদ্ধি,
কিংবা আর্থিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যেও অনেকে সাংবাদিকতায় যুক্ত হচ্ছেন।
এর ফলে কী সমস্যা তৈরি হচ্ছে?
১. পেশাদার সাংবাদিকতার মান ক্ষতিগ্রস্ত:
যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ, গুজব ছড়ানো ও অপেশাদার আচরণের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাচ্ছে।
২. চাঁদাবাজি ও অপব্যবহারের অভিযোগ:
কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অবৈধ সুবিধা আদায় কিংবা ব্ল্যাকমেইলের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে পুরো সাংবাদিক সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
৩. প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি:
কারা প্রকৃত সাংবাদিক আর কারা শুধুই পরিচয়পত্রধারী তা অনেক সময় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন না।
৪. সংবাদে প্রতিযোগিতার বদলে বিভাজন:
সংবাদ সংগ্রহের পরিবর্তে গ্রুপিং, দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। এতে সাংবাদিক সমাজের ঐক্য নষ্ট হচ্ছে।
৫. মানসম্মত স্থানীয় সংবাদ কমে যাচ্ছে
গুরুত্বপূর্ণ জনদুর্ভোগ, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য বা উন্নয়নমূলক সংবাদ আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। তার বদলে বাড়ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট।
সমাধানের পথ:
১. সাংবাদিকদের ন্যূনতম যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
মফস্বল পর্যায়ে সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও নৈতিকতা শিক্ষা জরুরি।
২. গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা বাড়ানো
যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়, তাদের অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। অবশ্যই শুধু কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ নয় বাস্তবে মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. সক্রিয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠন গড়ে তোলা
যোগ্য ও কর্মরত সাংবাদিকদের নিয়ে কার্যকর সংগঠন থাকলে অপেশাদারদের দৌরাত্ম্য কমবে।
৪. সরকারের গণমাধ্যম নীতিমালা বাস্তবায়ন,
নিবন্ধনবিহীন ও ভুয়া মিডিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
৫. সংখ্যার চেয়ে মানকে গুরুত্ব দেওয়া
একটি উপজেলায় শতাধিক নামধারী সাংবাদিকের চেয়ে ২০–৩০ জন দক্ষ, সৎ ও সক্রিয় সাংবাদিকই বেশি কার্যকর।
পরিশেষে বলতে চাই সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার পরিচয় নয়; এটি মানুষের কথা বলার দায়িত্ব। মফস্বলের সাংবাদিকতা শক্তিশালী হলে দেশের গণতন্ত্র ও স্থানীয় উন্নয়নও শক্তিশালী হয়। তাই সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে প্রয়োজন দক্ষ, নীতিবান ও জনমুখী সাংবাদিক তৈরি করা।