প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ৫:৩৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ৫:২৩ অপরাহ্ণ

চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীর কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির এই কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান মন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের আর্থিক সচ্ছলতা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শেরাটন হোটেলে ‘ন্যাশনাল সামিট অন ইয়াং উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপট এক নয়। তাই তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি অন্যান্য স্তরের নারীদেরও মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ করতে হবে। তরুণ ও নারীদের মধ্যে মেধা, সৃজনশীলতা এবং সুপ্ত প্রতিভার ঘাটতি নেই। প্রয়োজন যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম।
তিনি বলেন, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিতভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের কাছে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি, নীতিগত লক্ষ্য ও প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত রূপকল্প রয়েছে। দেশের উন্নয়নকে অর্থবহ করতে হলে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারীকে রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ-তরুণী। পাশাপাশি মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি নারী। তাঁদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।
নারীদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তিনজন মানুষ হিসেবে মা, স্ত্রী ও কন্যার কথা উল্লেখ করেন। নারীদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে বলে দাবি করেন মাহ্দী আমিন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে নারীর উন্নয়নে পৃথক মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের সূচনায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল। পরবর্তী সময়ে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার দ্বাদশ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননশীলতা বিকাশে শিক্ষা এবং খেলাধুলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, প্রাথমিক স্তর থেকেই খেলাধুলাকে গুরুত্ব দেওয়ার অংশ হিসেবে চতুর্থ শ্রেণি থেকে আগামী শিক্ষাবর্ষে নতুন বই চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বছর প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলার পাশাপাশি বিতর্ক, শিল্প-সাহিত্য ও কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এতে ১১ লাখ ছাত্রের পাশাপাশি সমানসংখ্যক ১১ লাখ ছাত্রী অংশ নিয়েছে। তাঁর মতে, খেলাধুলা শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পারস্পরিক যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করে এবং সাম্য ও বৈষম্যহীন পরিবেশ গঠনে ভূমিকা রাখে।
প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে মিড ডে মিল, বিনামূল্যে স্কুল পোশাক ও জুতা বিতরণের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মেয়েদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতার সুবিধাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রচলিত সনদনির্ভর ও মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, ভালো ফলের জন্য মুখস্থ করার চেয়ে বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন দক্ষতা অর্জন বেশি জরুরি।
তরুণদের গতানুগতিক পেশার বাইরে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও স্বল্পমেয়াদি কোর্সে আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা আইনজীবী হতে হবে, এমন নয়। মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যারা দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চান, তাঁদের জন্য তিন, ছয় ও নয় মাস এবং এক বছর মেয়াদি বিভিন্ন কোর্স চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি জাপানি, আরবি, ফরাসি, ইতালীয় ও কোরীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারীদের কর্মসংস্থানের চারটি ক্ষেত্র হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, নারীদের শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান তৈরিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে তরুণ ও নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সহজ শর্তে জামানতবিহীন স্বল্প সুদের ঋণ, উদ্ভাবনী ধারণার জন্য সিড ফান্ডিং এবং সরকারি অনুদানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমানে এই বাজারে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় পাচ শতাংশ। ফিলিপাইনের মডেল অনুসরণ করে নার্সিং, কেয়ারগিভিং ও বিশেষায়িত পেশায় উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের জন্য বিদেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভারী শিল্পের পাশাপাশি ছোট কারখানা, আধুনিক অফিস ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা পরিচালনায় নারীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে বৈষম্য কমবে, মেধার মূল্যায়ন হবে এবং প্রতিটি নাগরিকের প্রতিভা বিকাশে রাষ্ট্র সহায়তা দেবে।
জনগণের ক্ষমতায়নকে রাষ্ট্রের শক্তির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে হবে। তাঁদের আধুনিক বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার সহায়ক ভূমিকা পালন করতে চায়।
দেশের বিদ্যমান সমস্যার সমন্বিত সমাধান এবং উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকারি ও বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকার প্রশংসা করে মাহ্দী আমিন বলেন, এসব সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে। ভবিষ্যতেও উন্নয়ন অংশীদারদের একটি যৌথ প্ল্যাটফর্মে এনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে দেশের অগ্রযাত্রা এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এ এস এম রহমত উল্লাহ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শংকর, ‘আর্ন’ প্রকল্পের অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক কাজী মোখলেছুর রহমান এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মাহফুজুল আলম খান।