এক পাশে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি, অন্য পাশে বাজে পূজার ঘণ্টা। কেউ ছুটছেন নামাজ আদায়ে, কেউ ব্যস্ত দেবীর আরাধনায়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হলেও মানুষের মধ্যে নেই কোনো বিভেদ। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর সহযোগিতায় দীর্ঘ চার দশক ধরে এক অনন্য সম্প্রীতির বন্ধনে নড়াইলের মানুষ।
নড়াইল শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর তীরবর্তী মহিষখোলা এলাকায় দেখা মেলে এমনই এক অসাধারণ দৃশ্যের। এখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মহিষখোলা পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ ও মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির। দুটি ধর্মীয় উপাসনালয় যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে ধর্মের পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবিকতা ও ভালোবাসার বন্ধন অভিন্ন।
ছোট্ট একটি মাঠের পশ্চিম পাশে মসজিদ, উত্তর পাশে মন্দির। মাঝখানে রয়েছে কয়েকটি স্থাপনা। তবুও দুই ধর্মের মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব যেন নেই বললেই চলে।
স্থানীয়রা জানায়, ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মহিষখোলা পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ। প্রায় একই সময়ে গড়ে ওঠে পাশের সার্বজনীন পূজামন্দির। সেই থেকে সময়ের সঙ্গে বদলেছে এলাকার পরিবেশ, বেড়েছে মানুষের বসতি। কিন্তু বদলায়নি দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক।
প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে মসজিদে আজান হয়, মুসল্লিরা আদায় করেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। অন্যদিকে মন্দিরে চলে নিয়মিত পূজা-অর্চনা। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণায়।
তবে ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যেও রয়েছে একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। নামাজের সময় মন্দিরের আয়োজকেরা নিজেদের কার্যক্রম সীমিত রাখেন। নামাজ শেষ হলে আবার স্বাভাবিকভাবে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। কোনো লিখিত নিয়মের চেয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আন্তরিকতাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্ম আলাদা, কিন্তু সম্পর্কের বন্ধন অটুট মহিষখোলা এলাকার মানুষের কাছে মসজিদ ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান কেবল দুটি ধর্মীয় স্থাপনার সহাবস্থান নয়, এটি দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
এখানে মুসলমান ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করেন নির্বিঘ্নে। একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোকে তাঁরা সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচনা করেন।
মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভংকর সরকার বলেন, এ এলাকায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি হলেও কখনো পূজা-অর্চনা করতে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হইনি। ধর্ম নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। আমরা দুই ধর্মের মানুষ এখানে সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছি। আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। প্রত্যেকেই নিজের ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল।
তাঁর কথায় ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের এক সহজ সত্য সম্প্রীতি শুধু মুখের কথা নয়, বরং প্রতিদিনের আচরণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই তা টিকে থাকে।
একই অনুভূতি প্রকাশ করেন মহিষখোলা পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের ইমাম মো. ইনামুল হক। তিনি বলেন, পাশাপাশি মসজিদ-মন্দিরে নামাজ ও পূজা-অর্চনা পালনে অতীতে কোনো সমস্যা হয়নি। ভবিষ্যতেও এ সম্প্রীতি বজায় থাকবে বলে আশা করি।
দুর্গাপূজায় সম্প্রীতির রঙ শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে নড়াইলজুড়ে এখন উৎসবের আবহ। চলতি বছর জেলার তিন উপজেলায় মোট ৫৪৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় ২৪৯টি, লোহাগড়ায় ১৫০টি এবং কালিয়ায় ১৪৪টি মণ্ডপ রয়েছে।
প্রতিবছর দুর্গাপূজার সময় মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দিরে ভিড় করেন বিভিন্ন এলাকার ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। মন্দিরের পাশেই মসজিদের অবস্থান অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
একই এলাকায় দুটি ধর্মের উপাসনালয় এবং ধর্মীয় আচার পালনে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি দর্শনার্থীদের কাছেও সম্প্রীতির ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।
শুধু মহিষখোলা নয়, নড়াইল শহরের আরও কয়েকটি এলাকায় দেখা যায় এমন সহাবস্থানের চিত্র। শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় নিশিনাথতলা মন্দির ও পুলিশ ফাঁড়ি জামে মসজিদ এবং পুলিশ লাইন জামে মসজিদ ও সর্বমঙ্গলা মন্দিরও পাশাপাশি অবস্থিত।
এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নড়াইলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে।
সম্প্রীতির বন্ধন টিকে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল পাশাপাশি উপাসনালয় থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে মানুষের আচরণ, পারস্পরিক বিশ্বাস ও অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে।
মহিষখোলার মসজিদ ও মন্দির সেই মানবিক মূল্যবোধেরই এক জীবন্ত উদাহরণ।
চার দশকের বেশি সময় ধরে এখানে পাশাপাশি চলছে নামাজ ও পূজা। প্রজন্ম বদলেছে, সময় এগিয়েছে, কিন্তু দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান অব্যাহত রয়েছে।
চিত্রা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ ও মন্দির যেন প্রতিদিন নীরবে একটি কথাই মনে করিয়ে দেয় মানুষে মানুষে ভালোবাসা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকলে ধর্মীয় ভিন্নতা কখনোই সম্প্রীতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, পূর্বপুরুষদের গড়ে তোলা এই সৌহার্দ্যের বন্ধন আগামী প্রজন্মও একইভাবে আগলে রাখবে। নড়াইলের মহিষখোলার এই সম্প্রীতির গল্প ছড়িয়ে পড়ুক দেশজুড়ে, হয়ে উঠুক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অনুপ্রেরণা।
সম্পাদক : মোঃ খাইরুল ইসলাম চৌধুরী
কার্যালয়: চৌধুরী বাড়ী, শুড়িগাতী, নড়াগাতী, কালিয়া, নড়াইল।
যোগাযোগ: ০১৭১১৩৩২১২২
নড়াইলের কাগজ